শিরোনাম :
প্রচ্ছদ / Top 10 / আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের অপরিহার্যতা – পর্ব-২

আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের অপরিহার্যতা – পর্ব-২

hadis-2

আল্লাহর রহমত ও তাঁর হেকমতের দাবী হলো তাঁরই আইন ও অহী অনুযায়ী বান্দাহদের মধ্যে শাসন পরিচালিত হবে। কেননা মানবীয় যাবতীয় দুর্বলতা, প্রবৃত্তির অনুসরণ, অক্ষমতা থেকে আল্লাহ পবিত্র। তিনি সর্বদাই বান্দার যাবতীয় অবস্থা সম্পর্কে অবহিত। তাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতে কিসে কল্যাণ আর কিসে অকল্যাণ তা তিনি ভাল করেই জানেন।

মানুষের পারস্পরিক মতবিরোধ, দ্বন্দ্ব এবং জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর পক্ষ থেকে আইন ও বিধান ঠিক করে দেওয়া তাঁর বিশেষ রহমতের অন্তর্ভুক্ত। কেননা তাঁর আইন ও বিধানই ইনসাফ ও কল্যাণমূলক ফায়সালা দিতে পারে। তদুপরি মানসিক শান্তি ও সন্তুষ্টি লাভ করা যায়। বান্দাহ যখন জানতে পারে এ বিষয়ে যে ফয়সালা দেয়া হয়েছে তা সর্বজ্ঞানী সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর হুকুম, তখন সে তা সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করতে পারে।
যদিও সে ফায়সালা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে থাকে।

পক্ষান্তরে যখন সে জানতে পারে এ আইন তার মত মানুষের পক্ষ থেকে এসেছে যারা মানবীয় দুর্বলতা থেকে মুক্ত নয়, তখন সে সন্তুষ্টচিত্তে তা গ্রহণ করতে পারে না। ফলে মতবিরোধ ও দ্বন্দ্বের নিষ্পত্তি ঘটেনা বরং তা আরও দীর্ঘায়িত হয়। তাই আল্লাহ তাঁর রহমত ও করুণা হিসেবে তাঁর আইন অনুযায়ী শাসন পরিচালনাকে অত্যাবশ্যকীয় করে সুস্পষ্টভাবে তার পথনির্দেশ দিয়েছেন। তিনি এরশাদ করেছেন:

“ নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিচ্ছে যে, যাবতীয় আমানত তার উপযোগী লোকদের নিকট সোপর্দ কর। আর লোকদের মধ্যে যখন (কোন বিষয়ে) ফায়সালা করবে তখন তা ইনসাফের মধ্যে যখন (কোন বিষয়ে) ফায়সালা করবে তখন তা ইনসাফের সাথে করো। আল্লাহ তোমাদেরকে উত্তম নসীহত করেছেন। আল্লাহ সব কিছু শুনেন এবং দেখেন। হে ইমানদার লোকগণ আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করো তোমাদের মধ্য থেকে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের। অত:পর তোমদের মধ্যে যদি কোন ব্যাপারে মত বিরোধ সৃষ্টি হয় তবে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করো যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার হয়ে থাক। এটাই সঠিক কর্মনীতি এবং পরিণতির দিক দিয়েও উত্তম” (আন নেসা ৫৮ ও ৫৯)।

উল্লেখিত আয়াতে যদিও শাসন ও শাসিত এবং পরিচালক ও পরিচালিতদেরকে হেদায়েত দেয়া হয়েছে তথাপি তা সকল বিচারক ও শাসকের ব্যাপারে প্রযোজ্য। সবাইকে এ মর্মে হেদায়েত দেয়া হয়েছে যেন ইনসাফের সাথে বিচার ও শাসন করে। সাধারণ মুমিনদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন এ হুকুম গ্রহণ করে যা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী হয় এবং যে বিধান তিনি তাঁর রাসূলের উপর নাযিল করেছেন। আর উভয়কে হেদায়েত দেয়া হয়েছে যেন মত বিরোধের সময় আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করে।

উপসংহার
পূর্বের আলোচনায় (১ম পর্ব) এ কথা সুস্পষ্ট হয়েছে যে, আল্লাহর আইনের বাস্তবায়ন এবং সে অনুযায়ী শাসন পরিচালনা করা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ওয়াজিব করে দিয়েছেন। ইহা আল্লাহর গোলামী ও দাসত্ব এবং তাঁর রাসূল মুহাম্মদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) রিসালাতের সাক্ষ্য দেয়ার অনিবার্য দাবী।

আল্লাহর আইন থেকে পরিপূর্ণ অথবা তার কোন অংশ থেকে বিমুখ হওয়া
আল্লাহর আযাব ও শাস্তির কারণ হবে।

এ কথা সকল যুগ ও স্থানের রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে যে ভাবে প্রযোজ্য তেমনি ভাবে মুসলিম সমাজের জন্যও প্রযোজ্য। মত বিরোধের ক্ষেত্রে তা দু’দেশের মধ্যে হোক বা দু’দলের বা দু’জনের মধ্যেই হোক, সব অবস্থাতেই আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। কেননা সৃষ্টি যেমন আল্লাহর, আইনও বিধান দেওয়ার অধিকারও একমাত্র তাঁরই। যে ব্যক্তি এ ধারণা পোষণ করে যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধানের চেয়ে মানুষের আইন ও বিধান উত্তম তাঁর ঈমান নেই। অনুরূপ যে উভয় আইনকে সম পর্যায়ের মনে করে এবং যে আল্লাহ ও রাসূলের বিধানের পরিবর্তে মানবীয় আইনকে গ্রহণ করা বৈধ মনে করে তাদেরও ঈমান নেই। শেষোক্ত ব্যক্তি যদি এ বিশ্বাসও পোষণ করে যে আল্লাহর আইন শ্রেষ্ঠ, পরিপূর্ণ এবং ইনসাফ ভিত্তিক তবুও তার ঈমান থাকবে না।

অতএব সকল সাধারণ মুসলিম ও শাসকশ্রেণীর উপর ওয়াজিব হল, তারা যেন আল্লাহকে ভয় করে, নিজেদের দেশে আল্লাহর আইনকে প্রতিষ্ঠিত করে। শাসকরা যেন নিজেদেরকে এবং নিজেদের অধীনস্থদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করে এবং আল্লাহর আইন থেকে বিমুখ হওয়ার বিভিন্ন দেশে যা ঘটছে তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। পাশ্চাত্যের অনুসরণ করার ফলে সেখানে কি ঘটছে? মত-বিরোধ, দলাদলি, হাঙ্গামা, বিপর্যয়. শাস্তি ও কল্যাণের অভাব, একে অপরকে হত্যা ইত্যাদি। আল্লাহর আইনের দিকে প্রত্যাবর্তন না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে থাকবে। আল্লাহ তা‘আলা যথাযথই বলেছেন :

“আর যে ব্যক্তি আমার যিকর (নাযিলকৃত হুকুম আহকাম) হতে বিমুখ হবে তার জন্য দুনিয়ায় হবে সংকীর্ণ জীবন। আর কিয়ামতের দিন আমি তাকে অন্ধ করে উঠাব। সে বলবে “ হে আমার প্রভু দুনিয়াতে আমি চক্ষুষ্মান ছিলাম এখানে কেন আমাকে অন্ধ করে উঠালে”। তিনি (আল্লাহ) বলবেন, “হ্যাঁ এমনি ভাবে তো আমার আয়াতগুলো তোমার কাছে এসেছিল তখন তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে। ঠিক সে রকম আজ তোমাকেও ভুলে যাওয়া হচ্ছে” (ত্বাহা ১২৪-১২৬)।

এর চেয়ে ভয়াবহ কঠিন অবস্থা আর কি হতে পারে যে, আল্লাহ নাফরমানদের এভাবে শাস্তি দিয়েছেন যে তারা আল্লাহর আইন ও বিধানের প্রতি সাড়া দিচ্ছে না। মহান রাব্বুল আলামীনের আইনের পরিবর্তে দুর্বল মানুষের গড়া আইনকে গ্রহণ করে নিয়েছে। এর চেয়ে হতভাগা আর কে হতে পারে যার কাছে আল্লাহর কালাম আছে যা সত্যের ঘোষণা দিচ্ছে, বিভিন্ন সুস্পষ্ট বর্ণনা পেশ করছে। সঠিক পথ দেখাচ্ছে এবং পথভ্রষ্টকে পথের সন্ধান দিচ্ছে অথচ সে কুরআনকে বাদ দিয়ে কোন মানুষের কথাকে অথবা কোন দেশের আইনকে গ্রহণ করছে। তারা কি জানেনা যে তারা দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে?

দুনিয়াতে তারা কল্যাণ লাভ করতে পারবে না এবং আখেরাতে আল্লাহর কঠিন শাস্তি ও আজাব থেকে নিষ্কৃতি লাভ করতে পারবে না; কারণ তারা আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক নিষিদ্ধ বিষয়কে হালাল করেছে এবং যা তাদেরকে করতে বলা হয়েছে তা তারা বর্জন করেছে।

আল্লাহর কাছে এ প্রার্থনা করছি আমার এ কথাগুলো যেন মুসলিম জাতিকে তাদের অবস্থা চিন্তা করার ব্যাপারে সজাগ করে দেয় এবং নিজের ও স্বজাতির ব্যাপারে যা করছে তা পর্যালোচনা করতে উদ্বুদ্ধ করে। তারা যেন হেদায়েতের দিকে ফিরে আসে। আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহর অনুসরণ করে যেন মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর খাঁটি উম্মত হতে পারে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি যেন শ্রদ্ধার সাথে তাদেরকে স্মরণ করে যেমনি ভাবে সালফে সালেহীন এবং উম্মাতের স্মরণীয় যুগের লোকদেরকে স্মরণ করা হয়। তাঁরা গোটা দুনিয়ার নেতৃত্ব দিয়েছিল। দুনিয়াবাসী তাঁদের অধীনস্থ হয়েছিল। আর তা সম্ভব হয়েছিল আল্লাহর সাহায্যের ফলে। আল্লাহর যে সব বান্দাহ তাঁর ও রাসূলের বিধান অনুসরণ করে আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করেন।

আফসোস, এ যুগে লোকেরা যদি বুঝত তারা কি মূল্যবান সম্পদ হারিয়েছে, কত বড় অপরাধ তারা করেছে। কি কারণে তারা আপন আপন জাতির উপর বিপদ মুছিবত ডেকে এনেছে! আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন:
“প্রকৃত কথা এই যে এ কিতাব তোমার জন্য এবং জাতির জন্য নসীহত ও উপদেশের বিষয়। আর অতি শীঘ্র তোমাদেরকে এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে” (আয-যুখরুফ-৪৫)।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর হাদীসে আছে, যার সারাংশ হলো:
“নিশ্চয় শেষ জামানায় বক্ষ ও গ্রন্থ থেকে কুরআনকে উঠয়ে নেয়া হবে যখন কুরআনের যারা মালিক (মুসলিমগণ) কুরআন প্রত্যাখ্যান করবে এবং তাঁর তেলাওয়াত এবং বাস্তবায়ন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে।”

এ মহা বিপদ থেকে মুসলিমদের সতর্ক থাকা উচিত। সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত যাতে তারা এ বিপদে আক্রান্ত হবে অথবা তাদের আচরণের কারণে তাদের ভবিষ্যৎ বংশধর আক্রান্ত না হয়ে পড়ে।
إ
ঐ সব মুসলিমদেরকেও আমি নসীহত করছি যারা আল্লাহর দ্বীন ও বিধানকে জেনেছে এর পরও মত বিরোধের মীমাংসার জন্য এমন লোকদের শরণাপন্ন হয় যারা যারা প্রচলিত রীতি নীতি অনুযায়ী ফায়সালা করে। যাদের কাছে আমার উপদেশ পৌঁছবে তাদের প্রতি আমার আবেদন থাকবে তারা যেন আল্লাহর কাছে তাওবা করে, হারাম কাজ কর্ম থেকে বিরত থাকে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়। অতীতে যা করেছে তার জন্য অনুতপ্ত হয়, অন্যান্য ভাইদের সাথে মিলে সমস্ত জাহেলী প্রথাকে বিলোপ সাধন করে। আল্লাহর আইনের সাথে সংঘর্ষশীল সামাজিক রীতি নীতির মূলোৎপাটনের চেষ্টা করে।

তওবার মাধ্যমে অতীতের অপরাধের ক্ষমা হয়। তওবাকারী ঐ ব্যক্তির মত যার কোন গুনাহ নেই। দায়িত্বশীল পর্যায়ের লোকদের উচিৎ সাধারণ লোকদেরকে নসীহত করা। উপদেশ প্রদান, সত্যকে তাদের সামনে তুলে ধরা এবং সৎ লোকের শাসান প্রতিষ্ঠা করা। এর মাধ্যমেই কল্যাণ লাভ করা যাবে ইনশাআল্লাহ্। আল্লাহর বান্দারা তাঁর নাফরমানী থেকে বাঁচতে পারবে।

আজকের মুসলিমদের জন্য তাদের আল্লাহর বা রবের রহমত কতই না প্রয়োজন। তিনিই পারেন তাঁর রহমত ও করুণায় মুসলিমদের অবস্থা পরিবর্তন করতে। অপমান ও গ্লানি থেকে মুক্ত করে সম্মান ও মর্যাদা দান করতে।

আল্লাহর উত্তম নামাবলী এবং গুণাবলির উসিলাতে তাঁর কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যেন মুসলিমদের অন্তর খুলে দেন যাতে করে তাঁর কালাম বুঝতে পারে। তাঁর অহী অনুযায়ী আমল করতে পারে। তাঁর আইন কানুনের সাথে সংঘর্ষশীল আইন কানুনকে বর্জন করতে পারে এবং শাসন ও বিধানকে একমাত্র তাঁর জন্যই নিরঙ্কুশ করতে পারে যিনি একক এবং যার কোন শরীক নেই।

“বস্তুত সার্বভৌম ক্ষমতা আল্লাহ ছাড়া আর কারো জন্য নয়।
তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যেন তোমরা তাঁকে ছাড়া আর কারো দাসত্ব ও গোলামী না কর।
ইহা সঠিক ও খাঁটি জীবন ব্যবস্থা। কিন্তু অধিকাংশ লোকই জানে না” (ইউসুফ: ৪০)।

মূল: আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন এবং এর পরিপন্থী বিষয় বর্জনের অপরিহার্যতা
আশ-শাইখ আব্দুল আযীয ইবন আবদুল্লাহ ইবন বায

অনুবাদ: আবু নায়ীম মোহাম্মদ রশিদ আহমদ

সম্পাদনা:
মোহাম্মাদ মতিউল ইসলাম
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

source: sorolpath.wordpress

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *