শিরোনাম :
প্রচ্ছদ / Top 10 / আল্লাহ বিস্মৃতি ও আত্মবিস্মৃতি

আল্লাহ বিস্মৃতি ও আত্মবিস্মৃতি

ঐ সব লোক যারা অন্য কোন জীবনে বিশ্বাসী নয়, ‘খাও-দাও ফুর্তি কর, জীবনের স্বাদ লুটে নাও’ ছাড়া অন্য কোন জীবন দর্শনে যাদের কোন বিশ্বাস নেই কিংবা ব্যক্তিগত ও জাতীয় সমুন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধি ছাড়া যারা আর কোন মহত্তর লক্ষ্যে বিশ্বাস রাখে না এবং আল্লাহর সঙ্গে এই নামকা ওয়াস্তে এই সামান্য কিছু ছাড়া যাদের কোন সম্পর্ক নেই তাদের সম্বন্ধে এই আশা পোষণ করা কতটা সঠিক হবে, কোন বিপদ মুহুর্তে তাদের ভেতর সকাতর অনুনয়-বিনয় দেখা দেবে এবং আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের অবস্থা সৃষ্টি হবে
কাফির মুশরিকদের সম্পর্কে কুরআন বলে “তারা বিপদ আপদের সময় কেবল আল্লাহকে ডেকে থাকে এবং এমনোতরো মুহুর্তে কেবল আল্লাহর কথাই স্মরণ হয়”। কিন্তু ইউরোপের বস্তুপূজারীরা বস্তুপূজার ক্ষেত্রে এতটা এগিয়ে যায় এবং বাহ্যিক উপায় উপকরণ ও কার্যকারণ তাদের উপর এতটা জেঁকে বসে, তাদের জীবনে আল্লাহবিমুখতা এবং হৃদয় এতটা কঠিন ও অনুভূতিশূণ্য হয়ে গিয়েছিল যে, তারা এই আয়াতের প্রতিপাদ্য বিষয়ে পরিণত হয়।

“তোমার পূর্বেও বহু জাতির কাছে রাসূল পাঠিয়েছি; তারপর তাদেরকে অর্থ-সংকট ও দুঃখ-ক্লেশ দ্বারা পীড়িত করেছি যাতে তারা বিনীত হয়। অনন্তর আমার শাস্তি যখন তাদের উপর আপতিত হলো তখন তারা কেন বিনীত হলো না? অধিকন্তু তাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গিয়েছিল এবং তারা যা করছিল শয়তান তা তাদের দৃষ্টিতে শোভন করেছিল”। [সূরা আনআম ৪২-৪৩]

“আমি ওদেরকে শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করলাম, কিন্তু ওরা ওদের প্রতিপালকের প্রতি বিনীত হলো না এবং কাতর প্রার্থনাও করলো না”।[সূরা মুমিনুন ৭৬]
অনন্তর আপনি যুদ্ধের কঠিনতম মুহুর্তেও ও সঙ্গীনতম সময়েও আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ, বিনীত অবস্থা, দিলের ভঙ্গুরতা, নমনীয়তা ও বান্দাসুলভ মানসিকতা তাদের ভিতর দেখতে পাবেন না। তেমনি জাতির আচার আচরণ, কার্যকলাপ, ক্রীড়া কৌতুক ও হাসি তামাশার ভিতরও আপনি কোন পার্থক্য দেখবেন না। পাশ্চাত্যের দার্শনিক ও চিন্তাশীল মহল, লেখক, কবি , সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এ নিয়ে গর্ব করে থাকে এবং একেই তারা মানসিক স্থৈর্য ও দৃঢ়তা, প্রশংসনীয় মনোবল এবং জাতীয় মর্যাদাবোধ বলে অভিহিত করে থাকে। প্রাচ্যের আল্লাহ পূজারী ও মুসলমানদের দৃষ্টিকোণ হতে এটাই হৃদয়হীনতা, গাফলতি ও ক্রীড়া কৌতুকে মেতে থাকা, সংজ্ঞাহীনতা ও আত্মবিস্মৃতি বৈ কিছু নয়!
“লন্ডনে একরাত” শিরোনামে লন্ডনেই বসবাসকারী জনৈক ভারতীয়(পরে পাকিস্তানী) ১৯৪০-৪১ সালের বিশ্বযুদ্ধকালীন বিমান হামলার সময়কার ঘটনা তাঁর নিজের আত্মজীবনীতে এভাবে পেশ করেছেনঃ

“আমরা সেই রাতে সমস্ত বন্ধু বান্ধব কয়েক দিন কয়েক রাত উপর্যুপরি বিমান হামলার ফলে অতিষ্ঠ হয়ে অবশেষে এক আড়ম্বরপূর্ণ সম্মিলিত ইংরেজ ভারতীয় খানাপিনার আয়োজনে মেতে উঠলাম। গৃহকর্ত্রী যিনি ছিলেন তিনি তার বাবুর্চিখানা ও যাবতীয় সামান আমাদের সোপর্দ করলেন এবং উপরতলার বড় কামরাটিও নাচের জন্য খালি করে দিলেন। আমরা জনা পঁচিশেক নারী পুরুষ সবাই মিলে নিজের হাতে রান্না করলাম। এরপর খানাপিনা শেষে নাচ-গান শুরু করলাম। এমন সময় অকস্মাৎ বিমান হামলার বিপদ সংকেত হিসেবে সাইরেন বেজে উঠল। প্রথমে তো আমরা একদম নিশ্চুপ হয়ে গেলাম। কিন্তু আমাদের নাচ অব্যাহত রইল। এমতাবস্থায় একজন বলে উঠল, এখন কি করতে চাও ? গো অন, চালিয়ে যাও, এই ছিল জনৈক মহিলার উত্তর। তারপর নাচগান পূর্বের মতই অব্যাহত রইল। আমরা নাচতে থাকলাম আর আমাদের নাচগান ও অট্টহাসির শব্দে বাড়ি তো বাড়ি- গোটা মহল্লাটাই কেঁপে উঠতে লাগল”। উদ্ধৃত অংশেরই কিছু উপরে তিনি লিখেছেনঃ
“অল্পদিন পরেই এটা আমাদের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হলো, প্রতিদিনই সন্ধ্যা ৭-৮টার দিকে সাইরেন বাজতো। শত্রু বিমানের প্রপেলারের ঘরঘর আওয়াজ শোনা যেত। সার্চ লাইটের জ্বলন্ত জাল আসমানে নিভে যেত। আর এ দিকে বিমান বিদ্ধংসী কামানের আওয়াজে কানে তালা লাগার জোগাড় হত। আসমান-যমীন কেঁপে উঠত থরথর করে। সে সেময় সিনেমা হলগুলোতে সিনেমা প্রদর্শন অব্যাহত থাকলে ছবি কিছুক্ষণের জন্যে বন্ধ হয়ে যেত এবং পর্দায় নিম্নোক্ত নির্দেশ ভেসে উঠতঃ   “এখন বিমান হামলা শুরু হয়েছে। কিন্তু তদসত্তেও ছবি প্রদর্শন অব্যাহত থাকবে। যেসব দর্শক আশ্রয় কেন্দ্রের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে চান যেতে পারেন। নিচে বাম দিকেই যাবার পথ রয়েছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, একজনও তার আসন ছেড়ে উঠত না, সবাই যার যার আসনে বসে থাকত, এরপর যথানিয়মে ছবি প্রদর্শন শুরু হয়ে যেত”।

“ক্রীড়া কৌতুক ও খেল-তামাশার মধ্যে এ ধরণের নিমগ্নতা ও আত্মবিস্মৃতির উদাহরণ প্রাচীন গ্রীস ও রোমেই কেবল দেখতে পাওয়া যায়। ইতিহাসে বর্ণিত আছে যে, ঐতিহাসিক পম্পেই নগরীতে যখন আগ্নেয়গিরিতে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আকাশ থেকে যখন জ্বলন্ত শিখা ও অগ্নিগিরি বর্ষিত হয় এবং মাটিতে ভূমিকম্প দেখা দেয় তখন ছিল দিনের বেলা। লোকজন এমফি থিয়েটারে(যেখানে একই সঙ্গে বিশ হাজার দর্শক উপবেশন করতে পারত) বসে সার্কাস দেখছিল যেখানে হিংস্র প্রাণী খাঁচার মধ্যে জীবন্ত মানুষকে ছিঁড়ে ফেলে ও কামড়ে খাচ্ছিল। ঠিক এমনি এক নিষ্ঠুর ও লোমহর্ষক খেলতামাশা চলাকালেই ভূমিকম্প শুরু হয় এবং শুরু হয় আকাশ থেকে অগ্নিবৃষ্টি। যে যেখানে ছিল সেখানে জ্বলে ভস্মীভূত হয়ে যায়। যারা বাইরে বেরিয়েছিল তারাও প্রচণ্ড অন্ধকারে পরস্পরের ধাক্কাধাক্কিতে আহত ও নিহত হয়। এভাবে আহত নিহতদের সংখ্যা যে কত ছিল কে তা নিরুপণ করবে? অল্প সংখ্যক সৌভাগ্যবান লোকই কেবল এই মহাদুর্যোগের হাত থেকে নৌকা ও জাহাজযোগে পালিয়ে জীবন রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিল। আঠারশো বছর যাবত এই শহর পৃথিবীর মানচিত্র থেকে হারিয়ে ছিল। ঊনবিংশ শতকের মধ্য ভাগেই কেবল জানা যায় এই শহরটি একেবারে হারিয়ে যায়নি, বরং মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। খনন কাজ শুরু হয় এবং কয়েক বছরের নিরন্তর চেষ্টার পরই সবক হাসিলের উপকরণরূপী মিউজিয়াম হিসেবে গোটা শহরটাই অবিকল আবিস্কৃত হয়”।

“তবে কি জনপদের অধিবাসীরা ভয় রাখে না যে, আমার শাস্তি তাদের উপর আসবে পূর্বাহ্নে যখন তারা থাকবে ক্রীড়ারত?” [সূরা আ’রাফ-৯৮]
আল্লাহ পূজারী, আল্লাহর পরিচয় সম্পর্কে যারা অবহিত তাদের কর্মপন্থা, জীবনধারা, চরিত্র ও ব্যবহার, যুদ্ধ বিগ্রহ ও কর্মপন্থার চাইতে কতটা ভিন্ন ও বিরোধী তার পরিমাপ কুরআন মাজীদের নিম্নোক্ত আয়াতের সঙ্গেও করা যেতে পারে।
“হে মুনিমগণ ! তোমরা যখন কোন দলের মুখোমুখি হবে তখন অবিচলিত থাকবে এবং আল্লাহকে বেশি স্মরণ করবে যাতে করে তোমরা সফলকাম হও” [সূরা আনফাল ৪৫]
সাহাবায়ে কিরাম রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম বলেন, যখনই কোন সমস্যা সংকুল ও সংকটজনক পরিস্থিতি এসে পড়ত অমনি রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। বদর যুদ্ধের সময় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাতার সোজা করেন, সাহাবায়ে কিরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম কে কাফিরদের মুকাবিলায় দাঁড় করিয়ে দেন এবং নিজ তাঁবুতে গিয়ে আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে গিয়ে মুনাজাত ও ফরিয়াদ করতে শুরু করেন। এ সময় তিনি বলছিলেন, “ হে আল্লাহ ! এই দলটি যদি আজ ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে দুনিয়ার বুকে তোমার ইবাদত বন্দেগী করার মত আর কেউই থাকবে না”।

মূলঃ মাযা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমীন
মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কি হারালো ?

মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী(র)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *