শিরোনাম :
প্রচ্ছদ / Top 10 / উহুদ যুদ্ধের শিক্ষা – দ্বিতীয় ভাগ

উহুদ যুদ্ধের শিক্ষা – দ্বিতীয় ভাগ

এমনিভাবে যারা বিশ্বাস করল যে, আল্লাহর সন্তান রয়েছে অথবা তাঁর কোন শরীক আছে অথবা আল্লাহর অনুমতি ব্যতীতই তাঁর কাছে কেউ সুপারিশ করতে পারবে অথবা আল্লাহর মাঝে এবং তাঁর মাঝে কোন মাধ্যম (মধ্যস্থতাকারী রয়েছে), যারা আল্লাহর কাছে মাখলুকের প্রয়োজন পেশ করে থাকে অথবা যে ধারণা করল যে, আল্লাহর কাছে যা আছে, তা আনুগত্যের মাধ্যমেও পাওয়া যাবে এবং নাফরমানীর মাধ্যমেও পাওয়া যাবে অথবা ধারণা করল যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোন কাজ ছেড়ে দিলে আল্লাহ্ তা‘আলা তার বদলে অন্য কিছু দিবেন না অথবা ধারণা করল যে, পাপ কাজের ইচ্ছা করলেই বিনা কারণে বান্দাকে শাস্তি দিবেন অথবা যে ব্যক্তি ধারণা করল যে, অন্তরে ভয় ও আশা নিয়ে নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর কাছে কাকুতি-মিনতি করলেও আল্লাহ্ তাকে নিরাশ করবেন অথবা ধারণা করল যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) এর শত্রুরা তাঁর জীবদ্দশায় কিংবা মৃত্যুর পর সর্বদা বিজয়ী থাকবে, তারাও আল্লাহর প্রতি খুব মন্দ ধারণা পোষণ করল।

যারা ধারণা করল যে, রসূল (সাঃ) মৃত্যু বরণ করার পর লোকেরা আহলে বাইতের উপর জুলুম করেছে এবং তাদের কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছে, আল্লাহর দুশমন এবং আহলে বাইতের দুশমনদের বিজয় হয়েছে, অথচ আল্লাহ্ আহলে বাইতকে সাহায্য করার ক্ষমতাবান হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাদেরকে সাহায্য করেন নি এবং যারা ধারণা করে যে, যারা রসূল (সাঃ) এর অসীয়তকে পরিবর্তন করেছে, তাদেরকেই (আবু বকর ও উমার (রাঃ) ) তাঁর পাশে কবর দেয়া হয়েছে আর উম্মাতে মুহাম্মাদী তাঁর উপর এবং তাদের উপর সালাম পেশ করছে, তারা কাফের ও বাতিলপন্থী এবং আল্লাহর প্রতি খুবই খারাপ ধারণা পোষণকারী। কারণ আল্লাহর প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করা কুফরীরই নামান্তর।

সুতরাং অধিকাংশ লোকই আল্লাহর প্রতি অন্যায় ও খারাপ ধারণা পোষণ করে থাকে। যাদেরকে আল্লাহ্ তা‘আলা তা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন সেই কেবল বাঁচতে পেরেছে। মানুষ মনে করে তাকে স্বীয় হক থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, অথবা কমিয়ে দেয়া হয়েছে, সে মনে করে, আল্লাহ্ তাকে যা দিয়েছেন, সে তার চেয়ে আরও বেশী পাওয়ার হকদার ছিল, মুখে উচ্চারণ না করলেও তার অবস্থার ভাষা বলছে, আমার রব আমার উপর জুলুম করেছেন, আমার অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত রেখেছেন। তার নফস্ এই কথার সাক্ষ্য দিচ্ছে। যদিও তার জবান তা অস্বীকার করছে। কেননা সে তা খোলাখুলি উচ্চারণ করতে সাহস পাচ্ছেনা। সুতরাং যে ব্যক্তি নিজের নফসের মধ্যে অনুসন্ধান চালাবে, সে তাতে এই কথার সত্যতা খুঁজে পাবে। এই ধারণাটি তার মধ্যে সেভাবেই লুকিয়ে থাকে যেমন আগুন দিয়াশলাইয়ের মধ্যে লুকায়িত থাকে। সুতরাং তুমি যদি এ কথার সত্যতা যাচাই করতে চাও, তাহলে কারও দিয়াশলাইয়ে আঘাত করে দেখ (কোন মানুষকে পরীক্ষা করে দেখ)। অচিরেই সে তার ভিতরের অবস্থা কিছু হলেও প্রকাশ করে দিবে। তুমি দেখবে, সে তার তাকদীরের উপর আপত্তি উত্থাপন করছে, স্বীয় তাকদীরকে দোষারোপ করছে এবং তাকদীরে যা লিখিত হয়েছে, তার বিপরীত প্রস্তাব করছে। কেউ কম করছে আবার কেউ বেশী করছে। প্রত্যেকের উচিৎ নিজ নিজ নফ্সের খোঁজ-খবর নেওয়া এবং আত্মসমালোচনা করা। সে এই রেসূ থেকে মুক্ত কি না? কবির ভাষায় বলতে গেলেঃ

فإن تنجُ منها تنجُ من ذي عظيمة  + وإلا فإني لا إخالك ناجيا

‘‘হে বন্ধু! তুমি যদি এ থেকে (তাকদীরের উপর আপত্তি করা থেকে) মুক্ত হয়ে থাক তাহলে জেনে রাখ তুমি বিরাট একটি মসীবত থেকে মুক্তি পেলে। এ থেকে মুক্তি না পেলে তুমি নাজাত পাবে বলে আমার মনে হয়না।

সুতরাং এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তিরই উচিৎ নিজ নিজ আত্মার খবর নেওয়া, আত্মাকে উপদেশ দেয়া এবং প্রতিটি মুহূর্তেই আল্লাহর প্রতি মন্দ ধারণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা, দু’আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। তিনি যেন তাকে তাঁর প্রতি খারাপ ধারণা থেকে মাহফুজ রাখেন এবং সেই অনুযায়ী আমলে সালেহ করার তাওফীক দেন। আমীন।

অতঃপর আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) আল্লাহর প্রতি মন্দ ধারণার বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। উহুদ যুদ্ধের দিন আল্লাহ্ তা‘আলা মুনাফেক ও দুর্বল ঈমানের অধিকারীদের প্রকৃত অবস্থা ফাঁস করে দিয়ে বলেন-

ثُمَّ أَنْزَلَ عَلَيْكُمْ مِنْ بَعْدِ الْغَمِّ أَمَنَةً نُعَاسًا يَغْشَى طَائِفَةً مِنْكُمْ وَطَائِفَةٌ قَدْ أَهَمَّتْهُمْ أَنْفُسُهُمْ يَظُنُّونَ بِاللهِ غَيْرَ الْحَقِّ ظَنَّ الْجَاهِلِيَّةِ يَقُولُونَ هَلْ لَنَا مِنَ الْأَمْرِ مِنْ شَيْءٍ قُلْ إِنَّ الْأَمْرَ كُلَّهُ لِلهِ يُخْفُونَ فِي أَنْفُسِهِمْ مَا لَا يُبْدُونَ لَكَ يَقُولُونَ لَوْ كَانَ لَنَا مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ مَا قُتِلْنَا هَاهُنَا قُلْ لَوْ كُنْتُمْ فِي بُيُوتِكُمْ لَبَرَزَ الَّذِينَ كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقَتْلُ إِلَى مَضَاجِعِهِمْ وَلِيَبْتَلِيَ اللهُ مَا فِي صُدُورِكُمْ وَلِيُمَحِّصَ مَا فِي قُلُوبِكُمْ وَاللهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ

‘‘অতঃপর তোমাদের উপর শোকের পর শান্তি অবতীর্ণ করলেন, যা ছিল তন্দ্রার মত। সে তন্দ্রায় তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ ঝিমোচ্ছিল আর কেউ কেউ প্রাণের ভয়ে (নিজের জীবনকে নিয়ে) ব্যস্ত ছিল। আল্লাহ্ সম্পর্কে তাদের মিথ্যা ধারণা হচ্ছিল মূর্খদের মত। তারা বলছিল আমাদের হাতে কি কিছুই করার নেই? তুমি বল, সবকিছুই আল্লাহর হাতে। তারা যা কিছু মনে লুকিয়ে রাখে-তোমার নিকট প্রকাশ করে না সে সবও। তারা বলে আমাদের হাতে যদি কিছু করার থাকতো, তাহলে আমরা এখানে নিহত হতামনা। তুমি বল, তোমরা যদি নিজেদের ঘরেও থাকতে তথাপি যাদের ভাগ্যে মৃত্যু লিখা ছিল, তারা তাদের মৃত্যুশয্যা পানে বের হয়ে পড়ত। তোমাদের অন্তরে যা রয়েছে, তার পরীক্ষা করা ছিল আল্লাহর ইচ্ছা, আর তোমাদের অন্তরে যা কিছু রয়েছে তা পরিষ্কার করা ছিল তার কাম্য। আল্লাহ্ মনের গোপন বিষয় জানেন’’।[1] আল্লাহর প্রতি মন্দ ধারণার কারণেই তারা বলেছিল- এ ব্যাপারে অর্থাৎ পরামর্শ দেয়া ও সিদ্বান্ত গ্রহণের ব্যাপারে আমাদের হাতে কি কিছু করার ছিল? তারা আরও বলেছিল, উহুদ যুদ্ধের ব্যাপারে সিদ্বান্ত গ্রহণে আমাদের হাতে যদি কিছু থাকত, তাহলে আমরা এখানে নিহত হতামনা। এই কথার মাধ্যমে তারা তাকদীরকে অস্বীকার করছে। তারা যদি তাকদীরের প্রতি বিশ্বাস করত, তাহলে তাদেরকে দোষারোপ করা হতনা এবং এই ভাবে জবাব দেয়া হতনাঃ আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন- قُلْ إِنَّ الْأَمْرَ كُلَّهُ لِلهِ তুমি বল, সবকিছুই আল্লাহর হাতে। এ জন্যই অনেকেই বলেছেন- তারা যেহেতু বলেছিল, এ ব্যাপারে তাদের হাতে যদি কিছু করার থাকত, তাহলে তারা নিহত হতনা, তাই তাদের এ কথা তাকদীরকে মিথ্যা বলারই শামিল। আল্লাহ্ তা‘আলা তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছেন। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন- সব কিছুই আল্লাহর হাতে। সুতরাং যা কিছু পূর্ব থেকেই তাকদীরে লিখিত আছে তাই হবে। যার ভাগ্যে নিহত হওয়া লিখিত আছে, সে ঘরে বসে থাকার ইচ্ছা করলেও যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে অবশ্যই নিহত হবে। এতে কাদরীয়া সম্প্রদায় তথা তাকদীরকে অস্বীকারকারীদের কড়া প্রতিবাদ করা হয়েছে।

উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের আরেকটি হিকমত হচ্ছে, তাদের অন্তরে যে ঈমান বা নিফাক লুকায়িত আছে, তা যাচাই ও পরীক্ষা করা। এতে মুমিনদের ঈমান আরও বৃদ্ধি পাবে। আর মুনাফেক এবং যাদের অন্তর রেসূাক্রান্ত তাদের নিফাকী প্রকাশিত হয়ে যাবে। মুমিনদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন করাও উদ্দেশ্য ছিল। কেননা মানুষের অন্তরে কখনও কখনও নাফসানী খাহেশাত, কুস্বভাব ও প্রবৃত্তির চাহিদা, সামাজিক রসম-রেওয়াজ প্রীতি, শয়তানের প্ররোচনা এবং গাফেলতি প্রবেশ করে থাকে। এতে অন্তরসমূহ প্রভাবিত হয় এবং এগুলো পরিপূর্ণ ঈমানের পরিপন্থীও বটে। মুমিনগণ যদি সবসময় বিপদমুক্ত থাকে এবং সুখ-সাচ্ছন্দে জীবন-যাপন করে তাহলে, তাদের অন্তর নিফাকী ও গাফেলতী থেকে পবিত্র হবেনা। সুতরাং এই পরাজয়ের মাধ্যমে তাদের উপর রহম করা হয়েছে। এটি বিজয়ের নিয়ামাত দান করার সমতুল্য।

অতঃপর আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন- যে সমস্ত খাঁটি মুমিন উহুদ যুদ্ধের দিন পলায়ন করেছিল, তারা তাদের পাপের কারণেই এমনটি করেছিল। শয়তান তাদেরকে এমন কাজের প্রতি উৎসাহিত করেছিল, যার মাধ্যমে শত্রুদের শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছিল। কেননা বান্দার আমলসমূহ কখনও তার পক্ষের সৈনিক হয় আবার কখনও তার বিপক্ষের সৈনিকে পরিণত হয়। সুতরাং যে মুহূর্তে মুমিন বান্দা শত্রুর মুকাবেলা করতে সক্ষম, তখন যদি সে ময়দান ছেড়ে পলায়ন করে তখন সেই পলায়ন তার এমন আমলের কারণেই, যার প্রতি শয়তান প্ররোচিত করেছিল।

অতঃপর আল্লাহ্ তা‘আলা সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি মুসলমানদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। কেননা তাদের এই পলায়ন নিফাকী বা রসূল (সাঃ) সত্য নাবী হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহের কারণে ছিলনা। এটি হয়েছিল আকস্মিকভাবে। এটি হয়েছিল তাদের কৃত কর্মের কারণে। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন-

أَوَلَمَّا أَصَابَتْكُمْ مُصِيبَةٌ قَدْ أَصَبْتُمْ مِثْلَيْهَا قُلْتُمْ أَنَّى هَذَا قُلْ هُوَ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِكُمْ إِنَّ اللهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

‘‘যখন তোমাদের উপর একটি মসীবত এসে পৌঁছাল, অথচ তোমরা তার পুর্বেই দ্বিগুণ কষ্টে পৌঁছে গিয়েছ, তখন কি তোমরা বলবে, এটা কোথা থেকে এল? তাহলে বলে দাও, এ কষ্ট তোমাদের উপর পৌঁছেছে তোমাদেরই পক্ষ থেকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ প্রত্যেক বিষয়ের উপর ক্ষমতাশীল’’। (সূরা আল-ইমরান-৩: ১৬৫)

মুসলমানদের বিপদাপদ ও কষ্টে নিপতিত হওয়ার বিষয়টি মক্কী সূরসূমূহে আরও বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন-

وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَنْ كَثِيرٍ

‘‘তোমাদের উপর যেসব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল এবং তিনি তোমাদের অনেক গোনাহ্ ক্ষমা করে দেন’’। (সূরা শুরা-৪২:৩০) আল্লাহ্ তা‘আলা আরও বলেন-

أَيْنَمَا تَكُونُوا يُدْرِكُكُمُ الْمَوْتُ وَلَوْ كُنْتُمْ فِي بُرُوجٍ مُشَيَّدَةٍ وَإِنْ تُصِبْهُمْ حَسَنَةٌ يَقُولُوا هَذِهِ مِنْ عِنْدِ اللهِ وَإِنْ تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ يَقُولُوا هَذِهِ مِنْ عِنْدِكَ قُلْ كُلٌّ مِنْ عِنْدِ اللهِ فَمَالِ هَؤُلَاءِ الْقَوْمِ لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ حَدِيثًا

‘‘তোমরা যেখানেই থাক না কেন; মৃত্যু কিন্তু তোমাদেরকে পাকড়াও করবেই- যদি তোমরা সুদৃঢ় দুর্গের ভিতরেও অবস্থান কর, তবুও। বস্ত্তত তাদের কোন কল্যাণ সাধিত হলে তারা বলে যে, এটা সাধিত হয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর যদি তাদের কোন অকল্যাণ হয়, তবে বলে, এটা হয়েছে তোমার পক্ষ থেকে, বলে দাও, এ সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে। তবে তাদের কী হল যে, তারা কখনও কোন কথা বুঝতে চেষ্টা করেনা’’। (সূরা নিসা-৪:৭৮) সুতরাং নিয়ামত অর্জিত হলে তা আল্লাহর ফজল ও করমের ফলেই হয়ে থাকে।

আর মসীবত নাজিল হলে তাঁর পক্ষ হতে ন্যায় বিচার ও ইনসাফের কারণেই হয়ে থাকে। পরিশেষে আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন- إِنَّ اللهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ নিশ্চয়ই আল্লাহ্ প্রত্যেক বিষয়ের উপর ক্ষমতাশীল’’। (সূরা আল-ইমরান-৩:১৬৫) তার আগে তিনি বলেন- যে মসীবতে তোমরা পড়েছ, তা তোমাদের হাতের কামাই। এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, ইনসাফের সাথে আল্লাহ্ তা‘আলার ক্ষমতা অত্যন্ত ব্যাপক। এখানে তাকদীর তথা ভাগ্যের লিখন এবং বান্দার প্রচেষ্টা- উভয়টি সাব্যস্ত করা হয়েছে। আমল ও চেষ্টার নিসবত (সম্বন্ধ) করা হয়েছে বান্দাদের দিকে এবং কুদরত তথা ক্ষমতার নিসবত (সম্বন্ধ) করা হয়েছে আল্লাহর দিকে। এখানে জাবরীয়া সম্প্রদায় অর্থাৎ যারা বলে, বান্দা যা কিছু করে তার সবই আল্লাহর পক্ষ হতেই হয়ে থাকে। তাতে বান্দার কোন হাত নেই। বান্দা কাঠের পুতুলের ন্যায় এবং শিশুর হাতে লাটিমের ন্যায়। শিশু লাটিম যেভাবে ঘুরায়, লাটিম সেভাবেই ঘুরে। বান্দার বিষয়টিও একই রকম। আল্লাহ্ তাকে যেভাবে চালান, সেভাবেই চলে। বান্দার কোন স্বাধীনতা নেই। সুতরাং ভাল-মন্দ সবই আল্লাহর পক্ষ হতে।

সেই সাথে এখানে কাদরীয়া সম্প্রদায় অর্থাৎ যারা তাকদীরকে অস্বীকার করে তাদেরও প্রতিবাদ করা হয়েছে। কাদরীয়াদের পরিচয় হল, তারা বলে বান্দার ভাল-মন্দ সকল কাজে বান্দা স্বাধীন। তাতে আল্লাহর কোন হাত নেই। এমন কি বান্দা কাজটি করার আগে আল্লাহ্ তা‘আলা জানতেও পারেন না।

কুরআন ও হাদীছের দলীল উপরোক্ত দলটির কঠোর প্রতিবাদ করেছে। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন-

لِمَنْ شَاءَ مِنْكُمْ أَنْ يَسْتَقِيمَ وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ

‘‘ তার জন্যে, যে তোমাদের মধ্যে সোজা পথে চলতে চায়। তোমরা আল্লাহ্ রাববুল আলামীনের অভিপ্রায়ের বাইরে অন্য কিছুই ইচ্ছা করতে পারনা’’। (সূরা তাকভীর-৮১:২৮-২৯) উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের যেই কষ্ট হয়েছিল তার দিকে ইঙ্গিত প্রদান করে নাযিলকৃত আয়াতে আল্লাহ্ তা‘আলার কুদরত (ক্ষমতার) উল্লেখ করার মধ্যে একটি সুক্ষ্ম বিষয় রয়েছে। তা হচ্ছে উহুদ যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে। সুতরাং এ বিষয়ে আল্লাহ্ যা বলেছেন, তা ব্যতীত অন্য কারও কাছে ব্যাখ্যা তলব করা ঠিক নয়। অন্য আয়াতে আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন-

وَمَا أَصَابَكُمْ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ فَبِإِذْنِ اللهِ وَلِيَعْلَمَ الْمُؤْمِنِينَ وَلِيَعْلَمَ الَّذِينَ نَافَقُوا

‘‘আর যেদিন দু’দল সৈন্যের মোকাবিলা হয়েছে; সেদিন তোমাদের উপর যা আপতিত হয়েছে তা আল্লাহর হুকুমেই হয়েছে এবং তা এজন্য যে, যাতে ঈমানদারদেরকে জানা যায়’’। (সূরা আল-ইমরান-৩:১৬৬-১৬৭) এখানে আল্লাহুর হুকুমেই উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদের পরাজয় হয়েছে, এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর হুক্মে তাকভীনি বা তাকদীরী। অর্থাৎ আল্লাহর সৃষ্টিগত হুকুম উদ্দেশ্য। যেই হুকুমের মাধ্যমে তিনি সকল বস্ত্ত সৃষ্টি করেছেন। শরীয়তের হুকুম উদ্দেশ্য নয়।

অতঃপর আল্লাহ্ তা‘আলা উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদেরকে পরাজিত করার মাধ্যমে খাঁটি মুমিনদেরকে জানতে চেয়েছেন এবং মুনাফেকদেরকে মুসলমানদের থেকে সুস্পষ্টভাবে পার্থক্য করতে চেয়েছেন। এর মাধ্যমে মুনাফেকরা তাদের অন্তরের গোপন বিষয় বের করে দিয়েছিল। মুমিনগণ তা শুনেও ফেলল এবং তারা আল্লাহ্ তা‘আলা কিভাবে তাদের জবাব দিয়েছেন তাও শুনতে পেল। সেই সাথে মুনাফেকদের ষড়যন্ত্র ও তার পরিণাম সম্পর্কেও জানা হয়ে গেল।

সুতরাং উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের ঘটনার মধ্যে যে কত হিকমত, নিয়ামাত ও উপদেশ নিহিত আছে, তার প্রকৃত হিসাব আল্লাহ্ ছাড়া আর কেউ জানে না।

পরিশেষে উহুদ যুদ্ধে ৭০ জন সাহাবী শাহাদাত বরণ করার কারণে মুসলমানদের অন্তরে যেই আঘাত লেগেছিল তা দূর করার জন্য আল্লাহ্ তা‘আলা তাদেরকে অত্যন্ত উত্তম ভাষায় শান্তনা দিয়েছেন। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন-

وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ فَرِحِينَ بِمَا آَتَاهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ وَيَسْتَبْشِرُونَ بِالَّذِينَ لَمْ يَلْحَقُوا بِهِمْ مِنْ خَلْفِهِمْ أَلَّا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ يَسْتَبْشِرُونَ بِنِعْمَةٍ مِنَ اللهِ وَفَضْلٍ وَأَنَّ اللهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِلهِ وَالرَّسُولِ مِنْ بَعْدِ مَا أَصَابَهُمُ الْقَرْحُ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا مِنْهُمْ وَاتَّقَوْا أَجْرٌ عَظِيمٌ

‘‘আর যারা আল্লাহর রাহে নিহত হয়, তাদেরকে তুমি কখনো মৃত মনে করোনা। বরং তাঁরা নিজেদের পালনকর্তার নিকট জীবিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত। আল্লাহ্ নিজের অনুগ্রহ থেকে যা দান করেছেন তার প্রেক্ষিতে তারা আনন্দ উদ্যাপন করছে। আর যারা এখনও তাদের কাছে এসে পৌঁছেনি তাদের পেছনে তাদের জন্য আনন্দ প্রকাশ করে। কারণ, তাদের কোন ভয়-ভীতিও নেই এবং কোন চিন্তা-ভাবনা নেই। আল্লাহর নিয়ামাত ও অনুগ্রহের জন্য তাঁরা আনন্দ প্রকাশ করে এবং তা এভাবে যে, আল্লাহ্ ঈমানদারদের শ্রমফল বিনষ্ট করেন না। যারা আহত হওয়ার পরেও আল্লাহ্ এবং তাঁর রসূলের নির্দেশ মান্য করেছে, তাদের মধ্যে যারা সৎ ও মুত্তাকী, তাদের জন্য রয়েছে মহান ছাওয়াব।[2] আল্লাহ্ তা‘আলা এই আয়াত সমূহে শহীদদের জন্য চিরস্থায়ী জিন্দিগী, আল্লাহর নৈকট্য প্রদান, অবিরাম রিযিক চালু রাখার ঘোষণা করেছেন। তাই শহীদগণ আল্লাহর অনুগ্রহ পেয়ে অত্যন্ত খুশী ও সন্তুষ্ট হয়েছেন। তাদের যে সমস্ত মুসলমান ভাই শহীদ হয়ে এখনও তাদের সাথে মিলিত হয় নি, পরবর্তীতে তারা শহীদ হয়ে এসে তাদের সাথে মিলিত হওয়ার সুসংবাদ শুনেও তারা আনন্দিত হয়। তাদের আনন্দ, নিয়ামাত, এবং সুসংবাদ প্রতি মুহূর্তে তাদের জন্য বর্ধিত সম্মান প্রাপ্তির মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করবে।

উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের বিপর্যয়ের বিনিময়ে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা অফুরন্ত নিয়ামাত প্রদানের কথা উল্লেখ করেছেন। যেই নিয়ামাতগুলোর তুলনায় উহুদ যুদ্ধের মসীবত খুবই সামান্য। নিয়ামাতগুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করলে উহুদ যুদ্ধে বা অন্যান্য ক্ষেত্রে মুসলমানদের কষ্টের অসিত্মত্বই খুঁজে পাওয়া যাবেনা। সেই নেয়ামতগুলোর অন্যতম হচ্ছে, আল্লাহ্ তা‘আলা তাদের মধ্য হতেই একজন রসূল পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের নিকট আল্লাহর আয়াত পাঠ করেন, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন, আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাত শিক্ষা দেন এবং গোমরাহীর অন্ধকার থেকে হিদায়াতের (আলোর) দিকে বের করেন। এই বিরাট কল্যাণের পর সকল বালা-মসীবত খুবই নগণ্য। আল্লাহ্ তা‘আলা আরও বলেছেন যে, এই মসীবতের কারণ স্বয়ং মুসলিমরাই। যাতে তারা আগামীতে সংশোধন হয়ে যায় এবং সাবধানতা অবলম্বন করে। আর তাদের এই পরাজয় পূর্ব নির্ধারিত তাকদীর অনুযায়ীই হয়েছিল। সুতরাং তাদের উচিৎ সবসময় এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর উপর ভরসা করা এবং আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় না করা। আল্লাহ্ তা‘আলা উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদের পরাজয়ের হিকমতগুলো এই জন্যই বলে দিয়েছেন, যাতে তারা আল্লাহ্ তা‘আলা কর্তৃক নির্ধারিত তাকদীরের প্রতি ঈমান আনয়ন করে এবং সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর হিকমতের উপর ইয়াকীন রাখে এবং আল্লাহর উপর কোন প্রকার খারাপ ধারণা পোষণ থেকে বিরত থাকে। সেই সাথে যাতে করে তাদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার আসমায়ে হুসনা ও সিফাতে কামালিয়াতের মারেফতও হাসিল হয়ে যায়।

পরিশেষে আল্লাহ্ তা‘আলা মুসলমানদেরকে শান্তনা দিতে গিয়ে বলেছেন যে, তিনি তাদেরকে এমন জিনিষ দিয়ে সম্মানিত করেছেন, যা বিজয় ও গণীমতের চেয়ে অনেক বড়। আর তা হচ্ছে শাহাদাতের মর্যাদা। এভাবে শান্তনা দেয়ার কারণ হচ্ছে, যাতে তারা তা পাওয়ার জন্য প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হয় এবং যারা নিহত হয়েছে তাদের জন্য চিন্তিত না হয়। সুতরাং এর জন্য আমরা আল্লাহর সেরকমই প্রশংসা করছি, যেমন প্রশংসা তিনি পাওয়ার হকদার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *