শিরোনাম :
প্রচ্ছদ / Top 10 / কথা-বার্তায় সংযত হওয়া এবং শব্দ নির্বাচন ও তা প্রয়োগে নাবী (সাঃ)-এর সতর্কতা

কথা-বার্তায় সংযত হওয়া এবং শব্দ নির্বাচন ও তা প্রয়োগে নাবী (সাঃ)-এর সতর্কতা

তিনি তাঁর ভাষণে সুন্দরতম শব্দ নির্বাচন করতেন এবং তাঁর উম্মাতের জন্যও তাই নির্বাচন করেছেন। অশ্লীল ও কঠোর শব্দ ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। তিনি কর্কশভাষী ছিলেন না, তিনি তা পছন্দও করতেন না, তিনি উঁচু আওয়াজে তথা চিৎকার করে ও কঠোর ভাষায় কথা বলতেন না। সম্মানী ব্যক্তি নয়- এমন ব্যক্তির জন্য তিনি উত্তম শব্দ ব্যবহার করা অপছন্দ করতেন। আর সম্মানী ব্যক্তির ক্ষেত্রে অপছন্দনীয় শব্দ ব্যবহার করাও তিনি সমর্থন করতেন না।

প্রথম প্রকারের উদাহরণ হল মুনাফিক লোককে কখনই সাইয়্যেদ (নেতা) বলা যাবেনা এবং আঙ্গুরকে কারাম বলা যাবেনা। এর উপর ভিত্তি করেই আবু জাহেলকে আবুল হাকাম বলা যাবেনা। তিনি সাহাবীদের মধ্যে আবুল হাকামের (বিচারকদের বিচারক) নাম পরিবর্তন করে আবু শুরাইহ রেখেছেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন- প্রকৃত বিচারক তো একমাত্র আল্লাহ্। তাঁর পক্ষ থেকেই ফয়সালা আসে। তিনি চাকরকে আদেশ দিয়েছেন, সে যেন তার মনিবকে রাববী তথা আমার প্রভু না বলে। এমনিভাবে মনিবকে বলেছেন সে যেন স্বীয় চাকরকে আবদী তথা আমার বান্দা এবং আমার বান্দী না বলে।  

এক ব্যক্তি নিজেকে ডাক্তার (চিকিৎসক) হিসাবে দাবী করলে নাবী (সাঃ) বললেন- তুমি হলে রফীক (রোগীর প্রতি দয়াকারী)। যিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন তিনিই তার প্রকৃত চিকিৎসক।[1] চিকিৎসা শাস্ত্রে সামান্য জ্ঞানের অধিকারী কাফেরদেরকেও জাহেলরা হাকীম (মহা চিকিৎসক, মহা জ্ঞানী) বলে থাকে। অথচ প্রকৃত হাকীম হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ্ তা‘আলা। আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সর্বাধিক মূর্খ হচ্ছে কাফেরের দল। রসূল (সাঃ) কোন এক বক্তাকে বলতে শুনলেনঃ

وَمَنْ يَعْصِهِمَا فَقَدْ غَوَى

‘‘যে ব্যক্তি তাদের উভয়ের (আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের) নাফরমানী করল সে ব্যক্তি গোমরাহ হল’’। এ কথা শুনে তিনি বললেন- তুমি খুব নিকৃষ্ট বক্তা। আসলে তার বলা উচিৎ ছিল এভাবেঃ 

مَنْ يُطِعِ اللهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ رَشَدَ وَمَنْ يَعْصِ اللهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ غَوَى

যে ব্যক্তি আল্লাহ্ এবং তাঁর রসূলের আনুগত্য করবে সে সুপথ প্রাপ্ত হবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্ এবং তাঁর রসূলের নাফরমানী করবে, সে গোমরাহ হবে। ঐ লোকটি প্রথমে আল্লাহর নাম উল্লেখ করে এবং রসূল কথাটি পরে উল্লেখ না করে সর্বনামের মাধ্যমে সরসূরি অর্থাৎ ‘তাদের উভয়ের’ কথাটির মাধ্যমে আল্লাহ্ এবং রসূলকে সমান করে দেয়ায় রসূল (সাঃ) তাকে নিকৃষ্ট বক্তা বলেছেন। এরই অন্তর্ভুক্ত নাবী (সাঃ) এর বাণীঃ তোমরা এ কথা বলোনা যে, مَا شَاءَ الله وشَاءَ فُلَانٌ অর্থাৎ আল্লাহ্ যা চান ‘এবং’ অমুক, আপনি বা সে যা চায়। বরং বলতে হবে যদি আল্লাহ চান কিংবা যদি আল্লাহ্ চান অতঃপর আপনি যদি চান। ‘এবং’-এর মাধ্যমে উভয়কে একই বিষয়ে একত্রিত করা হলে উভয়েই সমান ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে। অতঃপর-এর মাধ্যমে সেটি করা হলে তেমন কোন সন্দেহ হবেনা। যে ব্যক্তি শিরক থেকে বাঁচার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করেনা তার কথাও অনুরূপ। তার কথাঃ আমি আল্লাহর ভরসায় এবং তোমার ভরসায় আছি, আমি আল্লাহ্ এবং তোমার হেফাজতে আছি, আমার জন্য আল্লাহ্ এবং তুমি ছাড়া আর কেউ নেই, আমি আল্লাহর উপর এবং তোমার উপর ভরসা করছি, এটি আল্লাহ্ এবং তোমার পক্ষ হতে, আল্লাহর শপথ এবং তোমার হায়াতের শপথ ইত্যাদি। এ ধরণের অসংখ্য কথার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর সাথে সৃষ্টিকে (মানুষকে) শরীক করে থাকে। এই কথাগুলো ‘আল্লাহ্ যা চান এবং সে যা চায়’ বলা থেকেও অধিক নিকৃষ্ট।

তবে যখন বলবে যে, আমি আল্লাহর সাথে অতঃপর আপনার সাথে আছি, আল্লাহ্ যা চান অতঃপর আপনি যা চান তাহলে কোন সমস্যা নেই। যেমন তিন ব্যক্তির হাদীছে এসেছে, এখন আমি আল্লাহর অনুগ্রহ অতঃপর আপনার সাহায্য ব্যতীত ঘরে ফিরতে পারবনা।[2]

আর দ্বিতীয় প্রকারের উদাহরণ অর্থাৎ যে ব্যক্তি নিন্দার হকদার নয় তার ক্ষেত্রে নিন্দাসূচক শব্দ ব্যবহার করার উদাহরণ হচ্ছে, নাবী (সাঃ) যুগকে গালি দিতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন- আল্লাহই হচ্ছেন যুগ তথা যুগের ও তার ভাল-মন্দের সৃষ্টিকারী এবং যুগের পরিবর্তনকারী। যুগকে গালি দেয়াতে তিনটি সমস্যা রয়েছে।

 

(১) যে গালির হকদার নয়, তাকে গালি দেয়া। (২) যুগকে গালি দেয়া শির্কের অন্তর্ভুক্ত। কেননা যুগকে গালি দাতা এই মনে করেই গালি দেয় যে, উহা লাভ ও ক্ষতির মালিক এবং যুগ বা যামানা হচ্ছে জালেম। অনেক কবিই তাদের কবিতার মাধ্যমে যামানাকে গালি দেয় এবং বহু সংখ্যক অজ্ঞ লোকও যামানাকে লানত ও দোষারোপ করে থাকে। (৩) যারা যামানাকে গালি দেয়, দোষারোপ করে, মূলতঃ গালি তাদের উপরই পতিত হয়। প্রকৃত কথা হচ্ছে আল্লাহ্ তা‘আলা যদি মানুষের মনের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করেন, তাহলে আসমান-যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। কারণ তাদের অবস্থা যখন তাদের চাহিদা অনুযায়ী হয় তখন তারা যুগের প্রশংসা করে এবং তার গুণগুণ প্রকাশ করে। আর যখন তাদের অবস্থা এর বিপরীত হয় তখন তারা যুগকে গালি দেয়।

 

নাবী (সাঃ) বলেন- তোমাদের কেউ যেন (হোঁচট খেলে বা পা পিছলে পড়ে গিয়ে কিংবা কারও হাত থেকে কিছু পড়ে গেলে) এ কথা না বলে যে, শয়তান ধ্বংস হোক! কেননা এ কথা বললে তা শুনে শয়তান মোটা হতে থাকে। এমনকি ঘরের মত বড় হয়ে যায় এবং বলতে থাকে আমি স্বীয় শক্তিতে তাকে পরাজিত করেছি। বরং সে যেন বলেঃ বিসমিল্লাহ। কেননা এ কথা বললে শয়তান ছোট হতে হতে মাছির ন্যায় হয়ে যায়।[3]

 

অন্য হাদীছে আছে, বান্দা যখন শয়তানকে লানত করে তখন সে বলে তুমি তো একজন অভিশপ্তকেই অভিশাপ করছ। উপরের কথাটির মতই এ কথাটি বলা যে, আল্লাহ্ শয়তানকে লাঞ্জিত করুক, শয়তানের মুখকে কালো করুক এ জাতিয় সকল কথাতেই শয়তান খুশী হয়। সে বলেঃ বনী আদম জানে যে, আমার শক্তির মাধ্যমে আমি তাদের ক্ষতি করি। এ রকম বললে কোন উপকার তো হয়না; বরং শয়তানকে গোমরাহ করার কাজে সহায়তা করা হয়। যার উপর শয়তানের প্রভাব পড়ে তাকে নাবী (সাঃ) আল্লাহর নাম, আল্লাহর যিকির, আল্লাহর নাম উচ্চারণ এবং শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে বলেছেন। এটিই তার জন্য অধিক উপকারী এবং শয়তানের ক্রোধ বৃদ্ধিকারী।

নাবী (সাঃ) মানুষকে এও বলতে নিষেধ করেছেন যে, خبثت نفسي ‘খাবুছাত নাফসী’ অর্থাৎ আমার অন্তর নোংরা হয়ে গেছে। বরং সে যেন বলেঃ لقست نفسي‘লাকিসাত নাফসী’ অর্থাৎ আমার অন্তর দুষ্ট হয়েছে। উভয় বাক্যের অর্থ কাছাকাছি। তা হচ্ছে মন বিনষ্ট হয়ে গেছে। নাবী (সাঃ) خبث শব্দটি প্রয়োগ করা অপছন্দ করেছেন। কারণ তা কদর্যতা ও নোংরামীর মাত্রাতিরিক্ত অর্থ প্রকাশ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *