শিরোনাম :
প্রচ্ছদ / Top 10 / দুশ্চিন্তা, বিষণ্ণতা ও বিপদাপদের সময় নাবী (সাঃ) এর হিদায়াত

দুশ্চিন্তা, বিষণ্ণতা ও বিপদাপদের সময় নাবী (সাঃ) এর হিদায়াত

সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে আব্দুল্লাহ্ ইবনে আববাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, নাবী (সাঃ) বিপদ-মসীবতের সময় এই দু’আ পাঠ করতেনঃ

لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ الْعَظِيمُ الْحَلِيمُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ رَبُّ السَّمَوَاتِ وَرَبُّ الأَرْضِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ

‘‘আল্লাহ্ ব্যতীত সত্য কোন মাবুদ নেই। তিনি অতি মহান, অতি সহনশীল। আল্লাহ্ ব্যতীত কোন সঠিক ইলাহ্ নেই। তিনি বিশাল আরশের মালিক। আল্লাহ্ ব্যতীত সত্য কোন মাবুদ নেই। তিনি আসমান-যমীনের এবং মহান আরশের মালিক’’।[1]

তিরমিযী শরীফে আনাস বিন মালেক (রাঃ) হতে বর্ণিত, রসূল (সাঃ) বিপদাপদের সময় এই দু’আ পাঠ করতেনঃ

يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ برحمتِكَ أستغيثُ

‘‘ইয়া হাইয়্যু! (চিরঞ্জীব) ইয়া কাইয়্যুমু! (সকল বস্ত্তর রক্ষক) আমি তোমার রহমতের উসীলায় তোমার সাহায্য প্রার্থনা করছি’’।[2] তিরমিযী শরীফে আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রসূল (সাঃ) যখন কোন বিপদ দেখতেন, তখন আকাশের দিকে তাঁর পবিত্র মাথা উঠাতেন এবং বলতেন-

سُبْحَان الله الْعَظِيم

‘‘আমি প্রশংসার সাথে মহান আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছি’’।

আর দু’আয় যখন বেশী পরিশ্রম করতেন, তখন বলতেন-  يَا حَيُّ يَا الْقَيُّوْمُ ‘হে চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী’।[3]

আবু দাউদে আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) হতে মারফু সূত্রে বর্ণিত, রসূল (সাঃ) বলেন- বিপদগ্রস্ত লোকের দু’আ হচ্ছেঃ

اللّٰهُمَّ  رَحْمَتَكَ أرجُو فَلا تَكِلْنِى إلى نَفْسِى طَرْفَةَ عَيْنٍ وأصْلِحْ لى شَأنِى كُلَّهُ لا إلَهَ إلا أنْتَ

‘‘হে আল্লাহ্! আমি তোমার রহমতের আশা রাখি। আমাকে এক পলকের জন্যও আমার নিজের দিকে সোপর্দ করে দিওনা। তুমি আমার সকল অবস্থা সংশোধন কর। তুমি ব্যতীত কোন সত্য উপাস্য নেই।

আবু দাউদ শরীফে আসমা বিনতে উমাইস (রাঃ) হতে আরও বর্ণিত হয়েছে যে, একদা রসূল (সাঃ) আমাকে বললেন- আমি কি তোমাকে এমন কিছু দু’আ শিক্ষা দিবনা, যা তুমি মসীবতের সময় পড়বে? দু’আটি হচ্ছে এইঃ

اللهُ رَبِّى لا أُشْرِكُ بِهِ شيئًا

‘‘আল্লাহ্ আমার প্রভু। আমি আল্লাহর সাথে অন্য কিছুকে শরীক করিনা। অন্য এক বর্ণনায় এই দু’আটি সাত বার পাঠ করার কথা এসেছে। মুসনাদে আহমাদে আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, বান্দা যখন দুশ্চিন্তা ও পেরেশানীতে পতিত হয়ে এই দু’আটি পাঠ করবেঃ

اللّٰهُمَّ  إنِّى عَبْدُكَ ابنُ عَبْدِكَ ابنُ أمتِكَ ناصِيَتى بيَدِكَ مَاضٍ فِىَّ حُكْمُكَ عَدْلٌْ فىَّ قضاؤكَ أَسْأَلُكَ اللّٰهُمَّ  بِكُلِّ اسْمٍ هُوَ لَكَ سَمَّيْتَ بِهِ نَفْسَكَ أَوْ أَنْزَلْتَهُ فِي كِتَابِكَ أَوْ عَلَّمْتَهُ أَحَدًا مِنْ خَلْقِكَ أَوِ اسْتَأْثَرْتَ بِهِ فِي عِلْمِ الْغَيْبِ عِنْدَكَ أَنْ تَجْعَلَ الْقُرْآنَ رَبِيعَ قَلْبِي ونُورَ صَدْرى وجِلاءَ حُزنى وذَهَابَ هَمِّى إلا أذْهَبَ اللهُ حُزْنَه وهَمَّهُ وأبْدَلَهُ مكانَهُ فرحاً

‘‘হে আল্লাহ! আমি তোমার বান্দা। আমি তোমার এক বান্দা ও এক বান্দীর পুত্র। আমার কপাল তোমার হাতে। আমার ব্যাপারে তোমার হুকুম কার্যকর। আমার ব্যাপারে তোমার ফয়সালা ইনসাফপূর্ণ। আমি তোমার সেই প্রত্যেক নামের উসীলা দিয়ে তোমার কাছে প্রার্থনা করছি, যে নামের মাধ্যমে তুমি নিজের নাম করণ করেছ বা তোমার কিতাবে অবতীর্ণ করেছ বা তোমার কোন বান্দাকে শিক্ষা দিয়েছ অথবা যে নামগুলোকে তুমি নিজের জ্ঞান ভান্ডারে সংরক্ষিত করে রেখেছ, কুরআনকে আমার অন্তরের প্রশান্তি, বক্ষের নূর, দুশ্চিন্তা এবং পেরেশানী বিদূরিত হওয়ার মাধ্যমে পরিণত করে দাও। যে ব্যক্তি এই দু’আ পাঠ করবে, আল্লাহ্ তা‘আলা তার দুশ্চিন্তা ও পেরেশানী দূর করে আনন্দ ও খুশীর দ্বারা সেই স্থানকে পরিপূর্ণ করে দিবেন’’।[4]

 তিরমিযীতে সা’দ বিন আবু ওয়াক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রসূল (সাঃ) বলেছেন- মাছের পেটে থাকা অবস্থায় ইউনূস (আঃ) যে দু’আটি করেছিলেন, কোন মুসলিম যদি সেই দু’আ পাঠ করে, তার দু’আ (অবশ্যই) কবুল করা হবে।[5] অন্য বর্ণনায় আছে, নাবী (সাঃ) বলেন- আমি এমন একটি দু’আ সম্পর্কে অবগত আছি, কোন বিপদগ্রস্ত লোক তা পাঠ করলে আল্লাহ্ তা‘আলা তার সেই বিপদ দূর করে দিবেন। সেটি হচ্ছে আমার ভাই ইউনুস (আঃ) এর দু’আ। দু’আটি এইঃ

لا إِلَهَ إِلا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ

‘‘হে আল্লাহ! তুমি ব্যতীত কোন সত্য উপাস্য নেই; আমি তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। নিঃসন্দেহে আমি জালেমদের অন্তর্ভুক্ত’’।[6]

সুনানে আবু দাউদে আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে এক বর্ণনায় এসেছে, নাবী (সাঃ) আবু উমামা (রাঃ)    কে বলেছেন- আমি কি তোমাকে এমন একটি বাক্য শিক্ষা দিবনা, তুমি যদি তা পাঠ কর, তাহলে আল্লাহ্ তা‘আলা তোমার দুশ্চিন্তা দূর করে দিবেন এবং তোমার ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা করে দিবেন? বর্ণনাকারী বলেন- আমি বললামঃ হ্যাঁ, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে তা শিক্ষা দিন। তিনি বললেন- সকাল ও বিকালে তুমি পাঠ করবেঃ

اللّٰهُمَّ  إِنِّى أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ وأعوذبك من َالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَأعوذبك من الْجُبْنِ الْبُخْلِ وَغلبة الدَّيْنِ وَ قَهْرِ الرِّجَالِ

‘‘হে আল্লাহ! আমি উদ্বিগ্ন ও বিষণ্ণ হওয়া থেকে তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে অক্ষম ও আলস্য হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তোমার কাছে আরও আশ্রয় প্রার্থনা করছি কৃপণতা করা ও ভীরু হওয়া থেকে। হে আল্লাহ্! আমি তোমার কাছে ঋণের আধিক্য এবং পুরুষদের অন্যায় প্রাধান্য ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হওয়া থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি’’। আবু উমামা (রাঃ)     বলেন- আমি এই দু’আটি পাঠ করলাম। এতে আল্লাহ্ তা‘আলা আমার যাবতীয় দুশ্চিন্তা দূর করে দিলেন এবং ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দিলেন।[7]

ইমাম আবু দাউদ মারফু সূত্রে আরও বর্ণনা করেন যে, রসূল (সাঃ) বলেছেন- যে ব্যক্তি সর্বদা ইস্তেগফার পাঠ করবে, আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে সকল দুশ্চিন্তা হতে মুক্তি করে দিবেন, তার সকল সংকীর্ণতা ও অভাব দূর করে দিবেন এবং তাকে এমন স্থান হতে রিযিক দান করবেন, যার কল্পনাও সে করতে পারেনা।[8] সুনানের কিতাবসমূহে বর্ণিত হয়েছে, নাবী (সাঃ) বলেন- তোমাদের উপর আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা আবশ্যক। কেননা এটি হচ্ছে জান্নাতের অন্যতম একটি দরজা। এর মাধ্যমে আল্লাহ্ তা‘আলা মানুষের অন্তরের দুশ্চিন্তা ও পেরেশানী দূর করেন।[9]

মুসনাদে ইমাম আহমাদে বর্ণিত হয়েছে, নাবী (সাঃ) যখন কোন বিষয়ে বিপদাপদের আশঙ্কা করতেন, তখন তিনি দ্রুত সলাতের দিকে ছুটে যেতেন।[10] আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلاةِ إِنَّ اللهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

‘‘হে মুমিনগণ। তোমরা ধৈর্য ও সলাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন’’। (সূরা বাকারা-২:১৫৩)

ইবনে আববাস (রাঃ) হতে মারফু সূত্রে বর্ণনা করা হয়, যে ব্যক্তি দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়, সে যেন لاحول ولاقوة إلا بالله পাঠ করে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, এই বাক্যটি বেহেশতের অন্যতম একটি ভান্ডার।

দুশ্চিন্তা, বিষণ্ণতার উপরোক্ত চিকিৎসায় পনের প্রকার (রূহানী) ঔষধের বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে। এগুলোর উপর আমল করলেও যদি কোন ব্যক্তির দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতা দূর না হয়, তাহলে বুঝতে হবে যে, রেসূটি তার উপর মজবুত হয়েছে এবং স্থায়ী রূপ ধারণ করেছে। সুতরাং এর মূলোৎপাটন করা জরুরী।

  • ১. তাওহীদে রুবুবীয়াতের উপর পরিপূর্ণ ঈমান আনয়ন করা।
  • ২. তাওহীদে উলুহীয়াতের উপর পূর্ণ ঈমান আনয়ন করা এবং তা বাস্তবায়ন করা।
  • ৩. তাওহীদুল আসমা ওয়াস্ সিফাতের উপর দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা।
  • ৪. আল্লাহ্ তা‘আলা স্বীয় বান্দার উপর জুলুম করা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র, দৃঢ়তার সাথে এই ঘোষণা দেয়া এবং কোন কারণ ছাড়াই বান্দাকে শাস্তি দেয়া থেকে আল্লাহর যাতে পাকের পবিত্রতার ঘোষণা দেয়া।
  • ৫. বান্দা নিজেকে জালেম বলে স্বীকার করা।
  • ৬. আল্লাহর সর্বাধিক প্রিয় বস্ত্তর মাধ্যমে তথা আল্লাহ্ তা‘আলার আসমায়ে হুসনা ও সিফাতে কামালিয়ার উসীলা দিয়ে তাঁর নৈকট্য হাসিলের চেষ্টা করা। আল্লাহ্ তা‘আলার আসমা ও সিফাতগুলো যে সমস্ত অর্থ বহন করে, তার মধ্যে সর্বাধিক ব্যাপক অর্থবোধক নাম হচ্ছে الحي القيومচিরঞ্জীব এবং সকল বস্ত্তর প্রতিষ্ঠা, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রতিপালনকারী।
  • ৭. কেবল আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাওয়া।
  • ৮. আল্লাহ্ তা‘আলার কাছেই আশা করা।
  • ৯. আল্লাহ্ তা‘আলার উপর পূর্ণ ভরসা করা, তাঁর কাছেই সব কিছু সোপর্দ করা এবং বান্দা কর্তৃক এই কথার স্বীকারোক্তি প্রদান করা যে, আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর কপাল ধরে আছেন। তিনি যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই তাকে ঘুরান। বান্দার ব্যাপারে আল্লাহর হুকুমই কার্যকর হয় এবং আল্লাহর ফয়সালাই ইনসাফপূর্ণ।
  • ১০. জীব-জন্তু যেমন বসমেত্মর বাগানে বিচরণ করে, বান্দার উচিৎ ঠিক তেমনি কুরআনের বাগানে বিচরণ করা, শুবুহাত ও শাহওয়াতের (সন্দেহ ও কুপ্রবৃত্তির) অন্ধকারে কুরআন থেকে হিদায়াতের আলো গ্রহণ করা, কোন কিছু হারিয়ে গেলে কিংবা বিপদে পতিত হলে কুরআনের মাধ্যমে প্রশান্তি ও স্বসিত্ম  লাভ করবে এবং ধৈর্য ধারণ করবে। এর মাধ্যমেই তার অন্তরের রেসূ থেকে আরেস্যূ লাভ করবে, দুশ্চিন্তা দূর হবে, বিষণ্ণতা ও হতাশা অপসারিত হবে।
  • ১১. আল্লাহর দরবারে সদা ইস্তেগফার করবে।
  • ১২. আল্লাহর কাছে তাওবা করবে।
  • ১৩. আল্লাহর পথে জিহাদ করবে।
  • ১৪. গুরুত্ব ও প্রবল আগ্রহ নিয়ে সলাত কায়েম করবে।
  • ১৫. বিপদাপদ ও মসীবতের সময় বান্দা নিজেকে অসহায় মনে করবে এবং বিপদাপদ সংক্রান্ত সকল বিষয় আল্লাহর দিকেই সোপর্দ করে দিবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *