শিরোনাম :
প্রচ্ছদ / Top 10 / মাঃ বলল, এসবের মানে কি? – ছেলেঃ জীবনের মানে কি, মা?……সাহিদুল ইসলাম ভুঁইয়া

মাঃ বলল, এসবের মানে কি? – ছেলেঃ জীবনের মানে কি, মা?……সাহিদুল ইসলাম ভুঁইয়া

সুর্য অস্ত যাওয়ার ঘন্টা খানেক পরপর প্রায়ই ঘরের দরজায় একবার টুকি দিয়েই “আপা আপা, ভাবী ভাবী”বলে ডাক দেয়। দরজা খুলেই দুই পায়ে দাড়িয়ে থাকা একটি অর্ধবয়স্ক মহিলা আর পরনে জির্ণশীর্ন পুরাতন শাড়ী, হাতে বাজারের বেগে কিছু বক্স, মাথায় সুন্দর করে ঘুমঠা দেওয়া মহিলাটিকে কিছু বলার আগেই বাজারের বেগ থেকে দুটি বক্স বের করে দুহাত দিয়ে বাড়িওয়ালীর সামনে বাড়িয়ে দিয়ে-

মহিলাঃ-” আপা পুরান ভাত-তরকারী থাকলে আমারে দুইলা দিবেন, আল্লার কাছে দুয়া করুম আপা, আপা আফনের লাইগা দোয়া করুম”।
(এমন বিপদগ্রস্ত, কান্না কান্না অবস্থায় তার চাহনী, যা দেখে যেকোনো পাষাণ হৃদয়ও অসহায় ডাকে সারা দিতে কুন্ঠিতবোধ করবেনা)

বাড়িওয়ালীঃ-“দাও, বক্সটা দাও, দাড়াও, আমি দিচ্ছি”।
(পাতিল থেকে নতুন তরকারি আর টাটকা রান্না করা ভাত বক্স দুটোতে ভড়ে, মুখটা শক্ত করে লাগিয়ে দরজাটা খুলে মহিলাটিকে দিয়ে দিল)

মহিলাটি বক্স দুটো পেয়েই একটি হাজার দুঃখ্য ভুলানো হাসি ছেড়ে দিল, অতুলনীয় হাসি, যার তুলনা শুধু ঐ উপস্থিত সময়েই অনুভব করা যায়।
মহিলাঃ (খুব বিনয়ের সহিত) আফা, পুরান তরকারী আর ভাত থাকলে আমার জন্য রাইখা দিয়েন, আমি আইসা নিয়া যামু।(আর সালাম দিয়ে, মাথায় ঘুমটা তুলে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল)

একদিন পরপরই মহিলাটি নিয়মিত ভাত-তরকারী নিতে আসে, নিয়মিত আসায় বাড়িওয়ালীও তার বাসার পুরাতন ভাত-তরকারী জমিয়ে রেখে তাকে দিয়ে দেয়। আবার মাঝেমাঝে পুরাতন কাপড়ও চাই। বাড়িওয়ালীর ছেলে ও মেয়ে মহিলাটির আসা-যাওয়া বিরক্তিকর মনে করত। বিরক্ত হয়ে মাকে তারা এটা-সেটাও বলত।
এভাবে অনেকদিন কেটে যায়। মাঝেমাঝে অন্যান্য বাসা থেকেও ভাত-তরকারী সংগ্রহ করতে দেখা যায়। একদিন বাড়িওয়ালী দেখেই ফেলল, একটি প্লাস্টিকের বড় লাল বালতি দিয়ে ঐ মহিলা অনেক ভাত-তরকারী নিয়ে যাচ্ছে। সবমিলিয়ে বাড়িওয়ালীর মনে একটু-আধটু সন্দেহের সৃষ্টি হতে থাকে। যত দিন যায় ততই তার কৌতূহল জাগে মহিলাটির ব্যপারে তদন্ত করবার। বাড়িওয়ালী তার ভার্সিটিতে পড়ুয়া ছেলে ও মেয়ের নিকট মহিলার ঘটনাটি বিস্তারিত বলেই ফেলল।
তারা অর্ধবয়স্ক মহিলাটির রহস্য উদঘাটন করতে সাপ্তাহিক বন্ধ শুক্রবার এবং শনিবারকে ঠিক করে নিয়ে রহস্যজনক ঘটনাটির পোস্টমর্টেম উন্মোচন করার সিদ্ধান্তে উপনীত হল।
ঐদিন শুক্রবার, মাগরিবের নামাজের পরপরই, কলিংবেল না চেপে দরজায় কয়েকটা টোকা দিতেই।(কয়েক সেকন্ড পর)
বাড়িওয়ালীঃ কে…? কে…?
মহিলাঃ আফা! আমি, আমি, ভাত নিতাম আইছি! আফা!
বাড়িওয়ালীঃ দাড়াও, দাড়াও একটু, আসতেছি….!
(এমনি রুমের ভেতর থেকে দরজা খুলে বাড়িওয়ালীর হিজাব পড়া মেয়েটি এবং তার ছেলে বের হয়ে গেল। একজন বাসার নিচে এবং অন্যজন বাসার বাহিরে অদূরে রহস্য উন্মোচনের জন্য অপেক্ষা।
মহিলাটি ভাত-তরকারী নিয়ে নিচে নেমে এল, সাথে বালতি নিয়ে আসা দুইটি শিশুর কাছে একটি লাল বালতি, বালতির ভেতর পলিথিন দিয়ে সংরক্ষন করা ভাত এবং অন্য একটি শিশুর হাতে একটি বড় প্লাস্টিকের বক্স! বক্সের ভিতর তরকারী ভরপুর! মহিলাটি কি যেন কিছু কথা বলেই তিনটি শিশুকেই বালতি আর বক্স দিয়ে রেল লাইনের পাশ দিয়ে একটি ঝরাঝির্ন বিশাল বস্তির দিকে ইশারা দিয়ে ঐ দিকে পাঠিয়ে দিল। বাড়িওয়ালীর মেয়েটি ঐ তিনটি শিশুর পিছনে পিছনে সতর্কতার সাথে পিছু নিয়ে চলে গেল আর ছেলেটি একজন সাধারন ছাত্রের মতই মহিলার পিছু নিয়ে একটি ছোট্ট গলির রাস্তা দিয়ে প্রায় হাফ(০.৫) কিলোমিটারের চেয়ে বেশি দুরত্ব হেটে মহিলাটি একটি ৭তলা বিল্ডিংয়ে ডোকে পরল। ছেলেটি বিল্ডিংয়ে না ডোকে রাস্তার পাশেই একটি চায়ের দোকানে বসে গেইটের দিকে তাকিয়ে অতি আগ্রহে অপেক্ষা করছে। ৩০মিনিট হয়ে গেল এখনো বের হচ্ছে না, আরেক কাপ চা শেষ করতে না করতেই মহিলাটি একটি ছোট বস্তা কাদে এবং একটি বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে বেড়িয়ে আবার সেই রাস্তা দিয়েই হাটতে শুরু করল পিছনে পিছনে সেই ছেলেটিও। রেল লাইনের পাশ দিয়েই হাটতে লাগল।
(লাইনের পশ্চিম পাশে, ছোট ছোট ঘর, মাঝে মাঝে টিনের চাল, অর্ধেক আবার পানি রোদক শীট, তার উপর পলিথিনের তালী, বাশের সাথে আটকানো কয়েকটা কাপড় ঝুলছে, পাথরের উপর শিশুদের কিছু পেন্ট-শার্ট, খালি শরীরে শিশুরা, এদিক ওদিক খেলে বেড়াচ্ছে, শিশুদের অপরূপ হাসি আর কান্না, পরিবেশটা বেশ কোলাহল যুক্ত। দুই পাশে বসবাস করা শিশুদের জন্মস্থান এখানেই, নেই তাদের তাদের দাদা কিংবা বাবার বাড়ির নির্দিষ্ট ঠিকানা, জীবনের যত আনন্দ সবকিছু এখানেই, তিন বেলা পেট ভরে খাবার খাওয়ার কল্পনা যেন এখানে নিষিদ্ধ আর লিখা-পড়া….!!)
একটু রাস্তা হাটার পরপর মহিলা কাদ থেকে বস্তাটি নামিয়ে একটি ভাংগাচোরা টিনের রোমে ডোকে জিরিয়ে নেয়। যতই বস্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ছেলটি ভাবনা ততই বাড়তে লাগল (*মনেহয় তারা অভ্যাস বসতই এরকম করে অন্যের কাছ থেকে এনে এনে খায়, *এটা তাদের বদ অভ্যাস, *তাদেরকে আর এরকম খাবার দেওয়াই যাবে না ইত্যাদি)। ভাবনা কখনো ধনাত্বক কখনো বা ঋনাত্বক, এখনো কোন সিদ্ধান্তেই পৌছোতেই পারেনি, হাটা শেষ হয়নি। অন্ধকারের মাঝেই আবার চাদের আলো, সময়টা অনেক সুন্দর।
হঠাৎ দেখল তার তদন্তকারী ভোন রেল লাইনের পাশে একটি বস্তির ঘরের পাশেই দাড়িয়ে আছে, এখানেই কি ঠিকানার শেষ??
গালে হাত দিয়ে দাড়িয়ে আছে মেয়েটি, শিশুরা বালতি থেকে একটু একটু ভাত চুরি করে খাচ্ছে, মাঝে মাঝে একটি শিশু ধমকাচ্ছে, “তরা এমনে খাইলে আমি কিন্তু নাবিলা খালার কছে সব কইয়া দিমু, তরারে আর রাতে খাওন দিত না”।

কথাগুলো শুনছে আর দু চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছে মেয়েটির, এভাবে ঘন্টা খানেক দাড়িয়ে আছে। বিবেকের রক্তক্ষরণ হচ্ছে, বারবার ভেসে আসছে “ভাতের বালতির পাশেই তরকারীর বক্সটা, শক্তভাবে মুখটা লাগানো, কয়েকটা ছোট্ট শিশু, চুরি করে করে ভাশি ভাত খাচ্ছে, চুরি করে খাচ্ছে, খেয়ে খেয়ে একটু পরেই আবার এক মুঠো ভাত নিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে,” রেল লাইনের পাশ দিয়ে ভার্সিটিতে কিংবা প্রাইভেটে যাওয়ার সময় প্রায়ই দেখত কিন্তু এভাবে কোনদিন বস্তির শিশুদের নিয়ে চিন্তা করেনি মেয়েটি। কই, এত কান্নাতো কোনদিন কাদেনি।
মসজিদের মাইকে এশার সালাতের ধ্বণি, বস্তি থেকে বের হয়েই মাথায় কাপড় দিচ্ছে, হাতে একটা বাটি আর চামচ, ছোট্ট বস্তাটি বহন করতে কষ্ট হচ্ছে, কাদে না নিয়ে দুহাত দিয়ে লাল বালতিটির নিকট নিয়ে রাখল, আবার তার বস্তির দিকে আসল, একটি বড় সিলভারের পাতিল আর বসার জন্য পিড়ী হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসল, বস্তি রজ্যের শিশুদের রানীর বেশেই পিড়ীতে বসে সবকিছু গোচাচ্ছে, বক্সের তরকারী বড় পাতিলে রেখেই কয়েক মিনিট অপেক্ষা।
মুহুর্তেই এত শিশু কোত্থেকে আসল? সবার হাতে একটি করে প্লেইট, লাইন দরে দাড়িয়ে গেল, কিছুই বলতে হল না, সবাই খুশি, একশিশু অন্যশিশুর সাথে কথা বলছে আর আনন্দ জড়াচ্ছে, যতই সময় যাচ্ছে ততই লাইনে শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। তারা দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখছে আর রোমাল দিয়ে বারবার চোখ মুচ্ছে।

মা ফোন দিল, মেয়েটি মাকে বলল, “আম্মু বস্তিতে এসে দেখে যাও, মহিলাটি কি করছে?”

লাইনে শিশুর সংখ্যা বাড়তেই লাগল, পর্যায়ক্রমে যার যার প্লেইটে অল্প ভাত আর তরকারী, রেল লাইনের লোহার উপরে বসেই খাইতে লাগল, খাবার দেওয়া শেষ হইনি, এখনো অনেক শিশু খালি প্লেইট নিয়েই দাড়িয়ে আছে কিন্তু লাল বালতি আর পাতিলের খাবার প্রায় শেষ। নাবিলা বেগমের চেহারায় চিন্তার ছাপ স্পষ্ট!
ছোট্ট ছোট্ট ছেলে-মেয়েগুলো এখনো খালী প্লেইট নিয়ে দাড়িয়ে আছে, পাতিলে একটুও খাবার নেই!
এমন হৃদয়বিদায়ক দৃশ্য প্রায় প্রতিদিনই দেখছে তারা, কিন্তু হৃদয় দিয়ে এমনভাবে অনুভব করেনি কোনদিন।

শিশুরাঃ (প্লেইট মাথায় উপর রেখে বস্তির শিশুরা দু হাত দিয়ে প্লেইটটা দরে, কিছুটা নিম্ন স্বরে) খালাম্মা….! খাবার কি শেষ? আমরা তো পাইনি। আজকে কি না খেয়ে থাকবো? খালাম্মা….?

মহিলাঃ (কিছু না বলেই চুপচাপ পাতিলগুলো হাতে নিয়ে শান্তনার স্বরে) কি করব বল? আমিও তো খাইনি!
খালি প্লেইটগুলো হাতে ছোট্ট ছোট্ট শিশুরা আস্তে আস্তে এদিক-ওদিক হেটে চলে যাচ্ছে আর চাপা কান্নায় ভাই-বোন দু জনের চোখগুলোই লাল হয়ে গেছে। পাশ থেকে মা সবকিছু বুঝেও-

মাঃ(নিজের চোখ দুটো রোমাল দিয়ে মুছে তার ছেলে এবং মেয়েটিকে বলল) এসবের মানে কি?

ছেলেঃ(মাথাটা নিচু করে) মা!! জীবনের মানে কি?

(…….সাহিদুল ইসলাম ভুঁইয়া)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *